।।।। সচেতন হোন সুস্থ থাকুন।।।।।
৪ঠা ফেব্রুয়ারী বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। অনেক বছর ধরেই আমাদের দেশে এবং বিদেশে এটি পালিত হচ্ছে। এবারেও আমাদের অনেকেই বেশকিছু প্রোগ্রাম নিয়েছেন এবং সেগুলি পালন করছেন। তার মধ্যে র্যালী, সচেতনতা মুলক পোষ্টার, আলোচনা সভা, টিভি প্রোগ্রাম চলছে। আমাদের সমস্যা হচ্ছে প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সীমিত। ১৮ কোটি মানুষের দেশে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ আছেন তিনশ জনের মত আর ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র আছে প্রায় ৩০টি। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী আমাদের দেশে ১৮০টি ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র থাকা দরকার। অন্তত ৮০ টা সেন্টারে রেডিয়েশন থেরাপির মেশিন দরকার। হিসেবে প্রায় ২৫০ টা রেডিয়েশন এর মেশিন দরকার সেখানে আমাদের আছে মাত্র ৪৩ টা। চিকিৎসক এর সংখ্যাও অনেক হতে হবে। সেদিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। এছাড়া ক্যান্সার সার্জারি বিশেষজ্ঞ, স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ বা গাইনি অনকোলজিস্ট , সাপোর্টিভ, প্যালিয়েটিভ চিকিৎসক সহ রেডিওথেরাপি মেশিন চালানোর দক্ষ লোক মেডিকেল ফিজিসিস্ট এবং টেকনোলজিস্ট এর অভাব প্রকট। কেমোথেরাপি দেয়ার যে উন্নত ওয়ার্ড দরকার তা মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে রয়েছে। আরও প্রকট সংকট রোগ নির্নয় এর ব্যবস্থার অর্থাৎ প্যাথলজি এবং রেডিওলোজী বিভাগের।। এই সমস্যাগুলি রাতারাতি সমাধান করা যাবে না। এর জন্য সময় দরকার, দরকার সুষ্ঠু পরিকল্পনা, সুষ্ঠু পদক্ষেপ । সরকারী বেসরকারি সমন্বয়। এছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আমরা ব্যক্তিগত ভাবে, কিছু সাংগঠনিক ভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম চালাতে পারি কিন্ত প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল।
ক্যান্সার আমাদের শরীরের ভিতরই সৃষ্টি হয়। আমাদের শরীরে প্রতিদিনই কোটি কোটি নতুন কোষ তৈরী হচ্ছে এবং কোটি কোটি কোষ মরে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়া না থাকলে আমরা ছোট থেকে বড় হতাম না বা বেচে থাকতেই পারতাম না। এই প্রক্রিয়ায় কোন ভুল হলেই অস্বাভাবিক কোষ তৈরী হয় আর তা থেকেই হতে পারে ক্যান্সার। মানে আমাদের শরীরের যে কোন অংগের কোষ স্বাভাবিক আচরন না করলেই ক্যান্সার হতে পারে। কিন্তু তাহলে সবারই কি ক্যান্সার হতে পারে? হ্যা হতে পারে, কিন্তু হচ্ছে না। কারন এই ভুল গুলি মেরামত করার জন্য কয়েক ধাপে কয়েক রকমের ব্যবস্থা আমাদের শরীরে আছে। জীন পর্যায়ে মেরামতকারী জীন আছে, সে ব্যার্থ হলে টিউমার সাপ্রেসর জীন আছে। এছাড়া প্রোগ্রামড সেল ডেথ নামক আরেকটি ব্যাবস্থা আছে যাকে এপপটোসিস বলে। তারপর টেলোমারেজ এনজাইম আছে যেটা টেলোমেয়ার থেকে আসে। এতগুলো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যার্থ হলে তবেই ক্যান্সার হবে। ক্যান্সার প্রক্রিয়া অর্থাৎ সেই ভুলগুলি শুরু হওয়ার জন্য কতগুলি এজেন্ট আছে। যেমন রেডিয়েশন বা বিকিরণ, কিছু ব্যাক্টেরিয়া, ভাইরাস, বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ, এমনকি যে কোন আঘাত থেকেও হতে পারে। কিন্তু যদি কাউকে এই সব উপাদান থেকে নিরাপদে রাখা যায় তাহলে কি তার ক্যান্সার হতে পারে? হ্যা, পারে। কেননা এই উপাদান গুলি ক্যান্সার শুরুর প্রক্রিয়াকে উস্কে দিতে পারে। আর মুল বিষয় টি ঘটে আমাদের শরীরের ভিতরই, শরীরের স্বাভাবিক কাজ কর্মের কিছু ভুল ত্রুটি থেকে। যদিও বলেছি এই ভুলগুলি মেরামতের ব্যবস্থা আছে কিন্তু যে কোন সময়ই এই প্রতিরক্ষা মুলক ব্যবস্থার ব্যার্থতার জন্য ক্যান্সার হতে পারে। তাহলে আমরা কি করতে পারি? আমাদের কি কিছুই করার নাই? হ্যা আছে। আমরা এর প্রতিরোধে সেই এজেন্ট সমুহ থেকে দূরে থাকতে পারি। তাহলেই অনেকাংশে প্রতিরোধ করা যাবে। প্রায় ৪০ ভাগ ক্যান্সার প্রতিরোধ করা যায়। আর যদি ক্যান্সার হয়েই যায় তাহলে চিকিৎসা করতে হবে।
ক্যান্সার প্রতিরোধে আমরা যেমন কিছু জিনিষ পরিহার করতে পারি তেমনি চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতিকরনের মাধ্যমে আমরা চিরতরে মুক্তি পেতে পারি। আচার আচরন অভ্যাস পরিবর্তন যেমন ধুমপান, পান, সুপারি, জর্দা, গুল, খৈনি ইত্যাদি পরিহার করলে মুখ থেকে ফুসফুস এমন কি মুত্র থলির ক্যান্সার থেকে রক্ষা পেতে পারি। একই ভাবে মদ গাঁজা বা অন্যান্য নেশা জাতীয় দ্রব্য পরিহার করলেও শরীর ভাল থাকবে, রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়বে। কিছু খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করলে পাকস্থলী থেকে পায়ু পথ পর্যন্ত পুরো এলাকার ক্যান্সার থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। সুস্থ্য জীবন যাপন, শরীরের ওজন ঠিক রাখা ক্যান্সার থেকে রক্ষা পাওয়ার হাতিয়ার। কয়েকটা ভ্যাক্সিন নিলে জরায়ু মুখের ক্যান্সার এবং লিভার ক্যান্সার থেকে পরিত্রাণ মিলবে কিন্তু সেজন্য চাই সচেতনতা। আর ক্যান্সার শরীরে বাসা বাধছে কি না সেটা কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়। এটাকে স্ক্রীনিং বলে। উন্নত বিশ্বে এই সব পরীক্ষা নির্দিষ্ট বয়সে নিয়মিত করতে হয়। আমাদের দেশে এই কালচার নাই। বরং উল্টো কালচার জনপ্রিয়। ডাক্তারের কাছে গেলেই এক গাদা পরীক্ষা করতে দেয় বলে ডাক্তার কে গালি গালাজ করা আমাদের অত্যন্ত প্রিয় বিষয়। কিন্তু আমাদের যেসব আত্মীয় বিদেশে থাকেন বা যারা চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেছেন তাদের কাছে শুনে দেখেন কত রকমের পরীক্ষা করায় ওরা। আসলে নাড়ি টিপে আর যাই হোক ক্যান্সার নির্নয় বা চিকিৎসা করা যাবে না। সচেতনতার ব্যাপারটি এখানে। এই বিষয়গুলি আমরা বেশী করে বলতে চাই। এ নিয়ে আমার সহকর্মীরা এমাসে ঝাপিয়ে পড়েছেন।
আমি যে আশার কথা বলেছি তাই দিয়ে এ লেখা শেষ করব। বর্তমানে সার্জারী, রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, হরমোন থেরাপি, ইমিউন থেরাপি, টারগেটেড থেরাপির সাহায্যে ক্যান্সারের চিকিৎসা চলছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পরলে বেশীর ভাগ ক্যান্সার চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময় করা যাচ্ছে। পাশ্চাত্যে স্ক্রীনিং এর সাহায্যে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্নয় করা যায়, তাই ওসব দেশে চিকিৎসার ফল ভাল পাওয়া যায়। আমাদের দেশে রোগ ধরা পরে তৃতীয় বা চতুর্থ পর্যায়ে। তাই আমাদের দেশে চিকিৎসা করেও ভাল ফল পাওয়া যাচ্ছে না। সচেতনতার ব্যাপারটি এখানেই। এছাড়া বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার এই যুগে নিত্যই গবেষণা চলছে উন্নত ও আরও নিখুত আরও সুনির্দিস্ট চিকিৎসা পদ্ধতি আবিস্কারের। যে জেনেটিক পরিবর্তনের ফলে এই ক্যান্সারের উৎপত্তি এখন সেই জেনেটিক পরিবর্তনকে মেরামত করার ওষুধ আবিষ্কারের গবেষণা চলছে এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে সাফল্য এসে গেছে। ক্যান্সার আজ পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে। সাফল্য আমাদের সন্নিকটে।